ব্যাংকিং ও বীমা

জীবন বীমা কাকে বলে, কেন জীবন বীমা করবেন এবং জীবন বীমার গুরুত্ব

Table of Contents

জীবন বীমা কি বা জীবন বীমা বলতে কি বোঝায়?

জীবন বীমা হলাে মানুষের জীবনের ঝুঁকি এড়ানাের কৌশল। জীবন বীমা কারাে অকাল মৃত্যু, রােগ ব্যধি, অবসর জীবনের আর্থিক দৈন্যদশা ইত্যাদি থেকে মুক্তি পেতে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এজন্য বীমা গ্রহীতা তার নিজের জীবন বা অন্য কারাে জীবনের ঝুঁকি বীমা কারীর নিকট হস্তান্তর করে তার বিনিময়ে বীমাকারী নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম পাবে এবং তার বিপরীতে বীমাগ্রহীতা বা তার নােমেনিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি যুক্ত এক চুক্তি।

 

M.N. Mishra-র মতে, “জীবন বীমা চুক্তি হলাে এমন একটি চুক্তি যেখানে সেলামী অথবা কিস্তি পরিশােধের প্রতিদানে বীমাকারী বীমা গ্রহীতার মৃত্যুতে অথবা নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশােধের দায়িত্ব গ্রহণ করে।”

 

তাই বলা যায় যে, জীবন বীমা হলাে বীমা গ্রহীতা ও বীমাকারীর মধ্যে এমন এক লিখিত চুক্তি যার ফলে বীমাগ্রহীতা তার নিজের বা অন্যের জীবনের ঝুঁকির জন্য বীমাকারীকে নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম প্রদান করে তার মৃত্যু বা নির্দিষ্ট সময় পরে সে নিজে বা নােমিনি বীমাকারীর নিকট থেকে নির্দিষ্ট অর্থ পাবার প্রতিশ্রুতি পায়।

জীবন বীমা চুক্তির বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Life Insurance)

 

আমরা জীবন বীমার সংজ্ঞা পর্যালােচনা করলে জীবন বীমার নিম্ন বর্ণিত বৈশিষ্ট্যগুলাে দেখতে পাব

১. মানব জীবন সম্পর্কিত বীমা:

জীবন বীমার বিষয় হলাে মানব জীবন বীমা গ্রহীতার মৃত্যু, বার্ধক্য, দূর্ঘটনা, পঙ্গুত্ব, অবসর জীবনের অর্থ কষ্ট, অনুরূপ তার স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্যদের এ ধরনের বীমা চুক্তিতে বিবেচনা করা হয়।

 

২. বীমাযােগ্য স্বার্থ:

জীবন বীমার ক্ষেত্রে বীমাযােগ স্বার্থ থাকতে হবে যার সাথে আর্থিক স্বার্থ জড়িত তার উপর জীবন বীমা করা যায়। নিজ জীবন, স্ত্রী, ছেলে মেয়ে, মা-বাবা ও দেনাদার, ব্যবসায়ী অংশীদার প্রভৃতির উপর বীমা যােগ্য স্বার্থ বিদ্যমান।

 

৩. চূড়ান্ত সদ্বিশ্বারের চুক্তি:

জীবন বীমাও চূড়ান্ত বিশ্বাসের চুক্তি। উভয় পক্ষকে সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সঠিক ও নালুকিয়ে সকল তথ্য উপস্থাপন করতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে বীমা চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।

 

৪. প্রতিদান:

জীবন বীমার জন্য প্রতিদান আবশ্যক। বীমা গ্রহীতা নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম এক কালিন বা কিস্ততে বীমাকারীকে প্রদান করবে এবং বীমাকারী প্রতিদান স্বরূপ বীমাগ্রহীতার মৃত্যু বা নির্দিষ্ট সময়ের পর বীমা গ্রহীতাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিবে।

 

৫. নিশ্চয়তার চুক্তি:

জীবন বীমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলাে বীমা গ্রহীতার মৃত্যু বা নির্দিষ্ট সময় পর বীমা গ্রহীতা বা মনােনিত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদান করে। জীবন বীমা করলে অর্থ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে যা অন্য কোন বীমার ক্ষেত্রে প্রযােজ্য নয়।

 

৬. ক্ষতিপূরণ নীতি প্রযােজ্য নয়:

জীবন বীমার অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলাে জীবন বীমার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের নীতি প্রয়ােগ করা যায় না। কারণ মানুষের জীবনের মূল্য অর্থ দ্বারা পরিমাপ করা যায় না। একটি বীমা গ্রহীতা যে পরিমাণ ও যতটি পলিসি গ্রহণ করবে তার মৃত্যুতে বা নির্দিষ্ট সময় পর ঠিক তত পরিমাণই টাকা আদায় করতে পারবে।

 

৭. প্রস্তাবের স্বীকৃতি:

অন্যান্য চুক্তি থেকে জীবন বীমা চুক্তির প্রস্তাবের স্বীকৃতি অধিকতর কঠিন ও নিয়ন্ত্রিত। কারণ বীমাকৃত পক্ষ কর্তৃক মুদ্রিত নির্দিষ্ট প্রস্তাবনা পত্র প্রদান করে যার কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংযােজন করা যায় না। তাই জীবন বীমা চুক্তিকে প্রস্তাব বা শর্তানুগ চুক্তি বলে।

 

৮. মনােনয়ন:

জীবন বীমার ক্ষেত্রে বীমা গ্রহীতা বীমা করার সময় তার মৃত্যুতে কে টাকা পাবে তা ঠিক অথবা বীমার দাবীর পূর্ব পর্যন্ত যেকোন সময় মনােনয়ন পরিবর্তন করতে পারেন।

 

৯. অধিকারর্পণ বা হস্তান্তর:

বীমা গ্রহীতা বীমা যােগ্য স্বার্থ থাকুক বা নাথাকুক বীমা পত্র বৈধ প্রতিদানের বিনিময় বা স্নেহ-ভালবাসার সম্পর্কের কারণে বীমার অধিকার অর্পণ করতে পারে। অর্থাৎ জীবন বীমা পত্র হস্তান্তর যােগ্য।

 

১০. একতরফা চুক্তি:

অন্যান্য বীমার ন্যায় জীবন বীমা চুক্তি ও এক তরফা চুক্তি।

 

১১. শর্তাধীন চুক্তি:

জীবন বীমার ক্ষেত্রে বীমা দাবী পূরণ করার জন্য প্রয়ােজনীয় ও নির্ধারিত শর্তসমূহ পালন করতে হয়। তাই জীবন বীমাকে শর্তাধীন চুক্তি বলে।

জীবন বীমার সুবিধা সমুহ

ধারের জীবন থেকে ভবিষ্যৎ মুক্তি

আমাদের হাতে সবসময় টাকা থাকে না। কিন্তু আপনি যদি জীবন বীমা করিয়ে রাখেন তাহলে আপনার ভবিষ্যতের জন্য এক নিশ্চিত সঞ্চয় হতে থাকবে। আর পরে বার্ধক্যের সময় তা আপনি ব্যবহার করতে পারবেন। অৰ্থাৎ জীবনবীমা বার্ধক্যের সময় আপনার সাথী হয়ে দাড়াবে।

আর আপনার ভগবান না করুক কিছু খারাপ ঘটলেও জীবনবীমা থাকাকালীন  আপনার পরিবার পাবে আর্থিক ক্ষতিপূরণ।আর তার ফলে তাদের সংসারের খরচ চালাতে অসুবিধা হবে না কোনোদিন।তাই জীবনবীমা না থাকলে আজই করান জীবন বীমা।

 

দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য পূরণ 

অনেকের ধারণা জীবনবীমা করা হলে জীবিত অবস্থায় ব্যাঙ্কের চেয়ে তাতে কোনও বাড়তি আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায় না। কিন্তু আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করে প্রথম থেকে সেই অনুযায়ী  জীবনবীমা করেন তাহলে ভবিষ্যতে আপনার লক্ষ্য অবশ্যই পূর্ণ হবে। আর তার জন্য আপনাকে বেছে নিতে হবে নির্দিষ্ট আর্থিক সুবিধার পলিসি টার্ম।

 

আয়করের হাত থেকে কষ্টার্জিত টাকা বাঁচানো 

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছি যারা ইনকাম ট্যাক্সের আওতায় পড়েছি। আর বীমা করার মস্ত একটা সুবিধা হল, এই বীমার মাধ্যমে আপনি যেমন মাসিক বা ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক ও বাৎসরিক অনেকটা টাকা যেমন জমাতে পারেন তার সাথে আপনি আপনার অনেকটা টাকা আয়করের হাত থেকে বাঁচতে পারেন। তাই আপনি যদি চাকুরিজীবি বা ব্যবসায়ী যাই হোক না কেন অবশ্যই করুন জীবনবীমা।

 

আয় অনুযায়ী বীমা

জীবন বীমার রেঞ্জ অনেক বিশাল। এখানে যেমন আপনি পাবেন ন্যুনতম মূলধনের টাকার পলিসি, তেমনই আপনি আপনার আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী বড়ো মাপের আর্থিক সুবিধা যুক্ত পলিসি গ্রহণ করতে পারেন। বিভিন্ন সরকারি কোম্পানির সাথে সাথে বেসরকারি কোম্পানির নানা পলিসি আজ খবরের শিরোনামে।

এক বছর বয়সের শিশু থেকে বার্ধক্য বয়সের প্রবীণ নাগরিকদের জন্য পাবেন নানান বীমা। তাই সবার ভবিষ্যৎ আর্থিক সুবিধা সম্পন্ন করতে পারেন। নানান টার্ম, নানান কভারেজ  ও নমিনীযুক্ত জীবনবীমা পাওয়া যায় এখন। তাই আপনার পছন্দের জীবনবীমা গ্রহণ করুন।

 

নিজের ইচ্ছামতো টাকা ফেরত

আপনি হয়তো ভাবেন ব্যাঙ্কে টাকা রাখলে তা নির্দিষ্ট সময় অন্তর টাকা তুলে নিতে পারবেন সুদসহ। কিন্তু বীমার ক্ষেত্রে সেরকম সুবিধা পাওয়া যায় না বলেই অনেকের ধারণা। কিন্তু বর্তমানে অনেক জীবনবীমাতে মানি ব্যাক পলিসিও করা যায়, যার মাধ্যমে আপনি আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অন্তর টাকা তুলে নিতে পারবেন। আর এইভাবেই জীবনবীমা আপনাকে দেয় আপনার জমানো টাকার উপযুক্ত মূল্য।

 

জীবন বীমার গুরুত্ব বা কেন জীবন বীমা করা প্রয়োজন?

জিবন বীমার গুরুত্ব অপরিসীম। এ বীমা ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনেই শুধু গুরুত্ব বহন করে না, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনেও জীবন বীমা গুরুত্ব পূর্ণ অবদান রাখে।

নিম্নে জীবন বীমার গুরুত্ব বর্ণনা করা হলাে:

ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে জীবন বীমার গুরুত্ব

 

১. মৃত্যুজনিত ক্ষতি ও দুঃখ-দুর্দশা লাঘব

কোন উপার্যনকারী ব্যক্তির হঠাৎ মৃত্যু হলে পরিবারে অর্থনৈতিক ধস নেমে আসে, সংসার পরিচালনায় রিতিমত হিমসিম খেতে হয়। সেক্ষেত্রে জীবন বীমা এক বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে কাজ করে। জীবন বীমা আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদান করে। ফলে আর্থিক কষ্ট লাঘব হয়।

See also  বাংলাদেশের কোন ব্যাংক এর মালিক কে?

 

২. বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন

বার্ধক্য হয়ে গেলে মানুষ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তখন চিকিৎসা, সংসার চালানর অর্থ থাকে না, ফলে আর্থিক কষ্ট ভােগ করতে হয় অনেকের। সেক্ষেত্রে জীবন বীমা অবসর সময়ে আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদান করে।

 

৩.উপার্জন বন্ধজনিত কষ্ট লাঘব

অনেক কারণে হঠাৎ করে উপার্জন বন্ধ হতে পারে। যেমনঃ হারান, দূরারােগ্যব্যধি, পঙ্গুত্ব, প্রর্ভতি কারণে উপার্জন বন্ধ হতে পারে। জীবন বীমা এক্ষেত্রে আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে।

 

৪. ঋণ পরিশােধ

মানুষ বিবিধ কারণে ঋণ গ্রস্থ হয়ে পড়ে। জীবন বীমা ঋণ পরিশােধে সহায়তা করে, এমনকি নতুন ঋণ মঞ্জুর করে থাকে।

 

৫. সঞ্চয়ে উৎসাহী করে

বীমাকারী জীবন বীমার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বীমা গ্রহীতার নিকট থেকে নির্দিষ্ট হারে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রিমিয়াম গ্রহণ করে থাকে। এ প্রিমিয়াম প্রদান করার জন্য বীমা গ্রহীতাদেরকে সঞ্চয় করতে হয়। এভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে উঠে। মেয়াদ শেষে মােটা অংকের টাকা একত্রে পায় যা দ্বারা লাভজনক প্রকল্পে বিনিয়োেগও করতে পারে।

 

৬. ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি

জীবন বীমার মেয়াদ শেষে প্রত্যেক বীমা গ্রহীতা বড় অংকের টাকা একত্রে পায়। এ টাকা বিভিন্ন ভাবে বিনিয়ােগ করে অর্থনেতিক সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে।

 

৭. মানসিক প্রশান্তি

জীবন বীমা করার ফলে মানুষ অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকে। মানসিক ভাবে প্রশান্তি লাভ করে। কোন ধরনের আর্থিক কষ্টে পড়তে হবেনা বলে ভাবনাহীন জীবন যাপন করতে পারে।

 

৮. আয় কর রেয়াত লাভ

জীবন বীমার প্রিমিয়ামের টাকা আয়কর মুক্ত থাকে বলে বীমা গ্রহীতা আয়কর রেয়াত সুবিধা ভােগ করে।

 

৯.বীমাকারী প্রতিষ্ঠানের সমৃদ্ধি

উন্নতি লাভে জীবন বীমার গুরুত্ব ও জীবন বীমা জনপ্রিয়তা লাভ করায় বীমাকারী প্রতিষ্ঠান অধিক সংখ্যক বীমা গ্রহীতা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। তাদের দাবী মিটানাের পর প্রচুর অর্থ লাভ থাকে বিধায় তারা লাভজনক ব্যবসায়ে বিনিয়ােগ করে আরাে লাভবান হতে পারে। আবার জীবন বীমার দাবী সাধারণত বেশী সময় পর হয়ে থাকে। ফলে বীমাকারীগণ জীবন বীমা থেকে প্রাপ্ত প্রিমিয়াম বাবদ টাকা দীর্ঘ মেয়াদী বিনিয়ােগে ব্যবহার করে লাভবান হতে পারে।

জীবন বীমার অসুবিধা সমূহ

বয়স অনুযায়ী পলিসি

অনেকেই  জানেন না যে জীবন বীমা হয় বয়স অনুযায়ী। আপনি যদি কম বয়স থেকে জীবন বীমা করিয়ে থাকেন তাহলে আপনার গাঁটের টাকা কম খরচ হবে। আবার বয়স বাড়ার সাথে সাথে আপনার মাসিক বা ষান্মাসিক বা বাৎসরিক পলিসির  টাকার পরিমান বাড়তে থাকে। যেমন  আপনার ছেলের বয়স ১৫ হলে আর আপনার বয়স ৪০ বছর হলে যদি দুজনের জন্যই  ১৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সুবিধাযুক্ত  জীবন বীমা করানোর কথা ভাবেন তাহলে আপনি দেখতে পারেন আপনার ছেলের জন্য বীমার পলিসি আর আপনার জন্য বীমার পলিসি অনেক টাকার পার্থক্য হবে। আর তাই অনেকেই জীবন বীমার এই নীতিকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া বলে মনে করেন।

 

ভুয়ো  কোম্পানির টাকা হাতিয়ে নেওয়া 

আজকে আমাদের দেশে সরকারি বেসরকারি বীমা কোম্পানি অনেক। এদেরই মধ্যে আছে অনেক ভুয়ো কোম্পানি। আর তাই সব কিছু কাগজপত্র দেখেই বেসরকারি কোম্পানির জীবনবীমা করান। আমরা কিছুদিন আগেই “সাহারা’র মতো নামী কোম্পানির জালিয়াতির ঘটনা দেখেছি। তাই বীমার  কোম্পানির সব কিছু খবর নিয়ে তবেই বীমা করা কথা ভাবুন। বেসরকারি কোম্পানির লোভনীয় সুযোগ সুবিধা দেওয়ার নাম করে আপনার গচ্ছিত টাকা আত্মসাৎ করতে পারে।

 

জীবনবীমার জটিল প্ল্যান 

আমরা অনেকেই জীবন বীমা করানোর আগে ভালো করে খুঁটিয়ে পড়ি না জীবনবীমার নিয়ামবালী ও শর্তাবলী। কিন্তু পরবর্তীতে আমাদের প্রয়োজনে টাকা ফিরে পেতে বা  মৃত্যুকালীন ক্ষতিপূরণ ফিরে পেতে বেসরকারি কোম্পানির জীবন বীমা কোম্পানি থেকে আমাদের অনেক কষ্ট পেতে হয়। তাই পলিসি করার আগে জেনে নিন সবরকম নিয়মাবলী। আপনার পলিসি এজেন্টদের কাছে সবকিছু জেনে নিয়ে তবেই করুন পলিসি।

 

ঋণগ্রস্ত বীমা কোম্পানি

সরকারি কোম্পানি ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির লোভনীয় বীমা করানোর আগে ভালো করে যাচাই করে দেখে নিন সেই কোম্পানির আর্থিক সঞ্চয়ের দিক। অনেক সময় নানা বেসরকারি কোম্পানি নিজেদের ঋণগ্রস্ত ঘোষণা করে জনগণের টাকা আত্মসাৎ করে। তাই সবকিছু জেনে তবেই বেসরকারি কোম্পানির জীবন বীমা করুন।

 

টাকা ফেরতের নানান অসুবিধা

অনেকসময় জীবন বীমা করে তার ম্যাচুরিটি হওয়ার পর  টাকা ফিরে পেতে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বর্তমানের নতুন নানান নিয়ম বীমা পলিসিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেকের বীমার সময় ভোটার কার্ডের মাধ্যমে তা হওয়ার পর পরবর্তীতে আধার কার্ড জমা করার বা জন্ম সার্টিফিকেট বা মৃত্যু সার্টিফিকেট জমা করার মতো নানান সমস্যায় পড়ে সাধারণ গ্রাহক। তাই এখনও অনেক গ্রামীণ মানুষ, প্রান্তিক মানুষ নিজেদের সরিয়ে রেখেছেন জীবন বীমার আওতা থেকে। তাই সবকিছু জেনে অবশ্যই করুন জীবনবীমা, যা দেবে আপনার ভবিষ্যৎ আর্থিক সুবিধা।

 

জীবন বীমা করানো অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য কতটা জরুরী?

জীবন বীমা নিজের জীবনের এবং পরিবারের জীবনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যে খুবই জরুরী । কিন্তু স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে, যাদের আবার একটা সুষম স্থায়ী ইনকাম নেই, তাদের পক্ষে জীবন বীমা করাটা খুবই কঠিন বা জীবন বীমা করলেও সেটা চালিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন ।

তাই স্বল্প আয়ের লোকদের জন্যে জীবনবীমার প্রিমিয়ামটা সরকারের দিয়ে দেওয়া উচিত । ধীরে ধীরে ঐ সমস্ত স্বল্প আয়ের লোকেরা যখন মধ্যবিত্ত সমাজে সামিল হবে ( নিজেদের আয় বাডিয়ে ) তখন সরকার তাদের প্রিমিয়াম্র টাকা বন্ধ করবে এবং বেঁচে যাওয়া টাকাটা অন্য কোনো জন কল্যান মূলক কাজে খরচ করবে ।

 

অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে জীবন বিমার গুরুত্ব

জীবন বীমা শুধু ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে না অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

 

নিম্নে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে জীবন বীমার গুরুত্ব বর্ণনা করা হলােঃ

১. অর্থ ভান্ডার সৃষ্টি করে

বিপুল সংখ্যক বীমা গ্রহীতা জীবন বীমা গ্রহণ করে বিধায় তাদের নিকট থেকে প্রচুর অর্থ পাওয়া যায় যা দিয়ে লাভজনক প্রকল্পে বিনিয়ােগ করা যায়। ফলে মূলধন গঠন হয়ও দেশ অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধ

 

২. শিল্প ক্ষেত্রে অবদান

যেহেতু জীবন বীমার মাধ্যমে প্রচুর মূলধন গঠন হয়, তাই সে মূলধন দিয়ে শিল্পে বিনিয়ােগ করে শিল্পের প্রসার ও উন্নতি করা সম্ভব হয়। এতে দেশের শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি হয়।

 

৩. কর্মসংস্থান সৃষ্টি

জীবন বীমার প্রসারের সাথে সাথে বীমা কোম্পানীতে প্রচুর লােক চাকুরী সুবিধা পায়। আর বীমা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উৎপাদন মুখী প্রকল্পে বিনিয়ােগের ফলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়, যা দেশের বেকারত্ব কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

 

৪. সরকারী আয় বৃদ্ধি

জীবন বীমা প্রসারের ফলে বীমা কোম্পানী থেকে সরকার প্রচুর আয়কর আদায় করতে পারে। আবার বীমার সংগৃহীত অর্থ বিনিয়ােগ করার ফলে ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় সেখান থেকে সরকার রাজস্ব আদায় করে। তাই জীবন বীমা সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

 

৫. সামাজিক নিরাপত্তা

জীবন বীমার ফলে কোন লােকের মৃত্যুতে বেকারত্ব বা কর্মক্ষমতা হারালে বীমা আর্থিক ভাবে সাহায্য করে থাকে। এর ফলে যেমন পারিবারিক শান্তি শৃক্মখলা বজায় থাকে তেমনি সামাজিক শান্তি শৃক্মখলাও অটুট থাকে।

 

৬. প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে

সরকার প্রয়ােজনে জীবন বীমা কোম্পানী থেকে ঋণ গ্রহণ করে তা প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারে। যা দেশ ও জাতির জন্য বড় উপকারে আসতে পারে।

 

৭. মূদ্রাস্ফীতি রােধ করে

জীবন বীমার প্রিমিয়াম দিতে হয় ফলে সঞ্চয় করতে হয়। এর ফলে ভােগ কমে যায় ও বাজারে অহেতুক মুদ্রার প্রবেশ ঘটে না। যা মূদ্রাস্ফীতি রােধে অনেক সহায়ক ভূমিকা পালন করে। উপরিউক্ত আলােচনা থেকে দেখা গেল যে জীবন বীমা শুধুমাত্র মানুষের জীবনের ঝুঁকিই কমায় না ইহা বীমা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

 

জীবন বীমা কোম্পানি কখন টাকা দিতে অস্বীকার করেন?

জীবন বীমার ফর্ম পূরণ করার সময় সেখানে শারীরিক অবস্থা সহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করতে হয়। যদি সেক্ষেত্রে কোন তথ্যগত ফাঁকি দেন কিংবা ঠিকমত প্রিমিয়াম প্রদান না করেন তখন জীবন বীমা কোম্পানি নির্ধারিত টাকা না ও দিতে পারে।

See also  ইন্সুরেন্স বা বীমা সম্পর্কে বিস্তারিত

এর বাইরে বীমা করার সময় ফর্মে আরও কিছু কারণ বলা থাকে যেগুলোর ক্ষেত্রে বীমা কভারেজ পাওয়া যায় না (যেমনঃ আত্মহত্যা)। তো সেগুলোর কোন একটা যদি আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় সেক্ষেত্রেও টাকা পাবেন না।

তবে খুব জরুরী যেটা সেটা হল, শুধু বাড়তি মুনাফার লোভে নামসর্বস্ব বীমা কোম্পানিতে বীমা করলে আপনার দিক থেকে সব ঠিক থাকার পরেও তারা টাকা দেওয়া নিয়ে ঝামেলা করতে পারে এটা মাথায় রাখবেন। তাই বীমা করলে ভালো কোম্পানি বা বীমা কর্পোরেশনের মাধ্যমেই বীমা করা উচিত।

 

 

জীবন বীমার শ্রেণী বিভাগ (Classification of Life Insurance)

এর অনেক শাখা প্রশাখা আছে। জীবন বীমাকে বিভিন্ন দৃষ্টি কোন থেকে শ্রেণী বিভাগ করা হয়েছে। তবে এখানে এম, এন, মিশ্রা বীমার যে শ্রেণী বিভাগ করেছে তা বর্ণনা করা হলাে। তার মতে বিভিন্ন জীবন বীমাকে কয়েকটি বিশেষ ভাগে ভাগ করা যায়।

যথাঃ

  • বীমা পত্রের মেয়াদ অনুসারে
  • বীমা কিস্তি বা সেলামী পরিশােধের ভিত্তিতে
  • মুনাফায় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে
  • বীমাপত্রের সাথে যুক্ত বীমাকৃতদের সংখ্যার ভিত্তিতে
  • বীমা দাবী পরিশােধের পদ্ধতি অনুযায়ী।

 

বীমার মেয়াদ ভিত্তিক শ্রেণী বিভাগ (Classification on the Basis of Time)

মেয়াদী জীবন বীমা কাকে বলে?

মেয়াদের ভিত্তিতে যে জীবন বীমা করা হয় তাকে মেয়াদী জীবন বীমা বলে।

 

মেয়াদী জীবন বীমাকে আবার কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়।

যথাঃ

  1. আজীবন বীমাপত্র
  2. সাময়িক বীমাপত্র
  3. মেয়াদী বীমা পত্র
  4. উত্তর জীবী বীমা পত্র।

 

মেয়াদ ভিত্তিক বীমাপত্রসমূহ সম্পর্কে নিম্নে বর্ণনা করা হলােঃ

 

আজীবন বীমা পত্র কি বা কাকে বলে?

এ ধরনের বীমাকৃত ব্যক্তিকে বেচে থাকা অবধি প্রিমিয়াম পরিশােধ করতে হয় এবং তার জীবদ্দশায় বীমার টাকা ভােগ করতে পারে না। শুধুমাত্র বীমাকৃত ব্যক্তি মরার পরই দবী পরিশােধ করা হয়। এ ধরনের বীমা বীমাকৃত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে পরিবারের আর্থিক নিশ্চয়তায় প্রদান করে। একে আবার কিস্তি পরিশােধের ভিত্তিতে কয়েকটি উপশ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়।

নিম্নে আজীবন বীমার উপশ্রেণী বর্ণনা করা হলাে:

  • একক কিস্তি সম্পন্ন আজীবন বীমা পত্র: যে আজীবন বীমার জন্য একটি মাত্র কিস্তি দিতে হয় তাকে একক | কিস্তি সম্পন্ন আজীবন বীমা পত্র বলা হয়। বড় অংকের টাকা একত্রে পরিশােধ করতে হয় বলে এ ধরনেরবীমার প্রচলন বর্তমানে নেই বললেই চলে।

 

  • অবিরাম কিস্তি সম্পন্ন আজীবন বীমা পত্র ও এ ধরনের বীমায় বীমাকৃত ব্যক্তির সারা জীবন কিস্তি দিতে হয়। ফলে এ ধরনের বীমার বড় অসুবিধা হলাে মানুষের শেষ জীবনে প্রিমিয়ামের টাকা পরিশােধ কষ্টকর। তার ফলে এ ধরনের বীমার জনপ্রিয়তা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

 

  • সীমিত কিস্তি সম্পন্ন আজীবন বীমা পত্র ও এ ধরনের বীমার কিস্তি একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পরিশােধ করতে হয়। এরপর বীমাকৃত ব্যক্তি বেচে থাকলেও আর প্রিমিয়াম দিতে হয় না। এ ধরনের সুবিধা থাকায় এ রকম বীমা পত্রের জন প্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

 

  • রূপান্তর যােগ্য বা পরিবর্তনীয় আজীবন বীমা পত্র ও এ ধরনের বীমা পত্র পরবর্তীতে পরিবর্তন করা যায় বলে একে রূপান্তর যােগ্য আজীবন বীমা বলা হয়। পাঁচ বৎসর প্রিমিয়াম দেবার পর এটাকে রূপান্তর করা যায়। এ ধরনের রূপান্তরের ক্ষেত্রে কোন ডাক্তারী পরীক্ষার প্রয়ােজন হয় না। এক্ষেত্রে ৭০ বৎসর পর্যন্ত কিস্তি পরিশােধ করতে হয় এবং মেয়াদ শেষে আজীবন বীমার সুবিধা ভােগ করেন। পক্ষান্তরে মেয়াদী বীমায় রূপান্তর করা হলে মেয়াদ শেষে মেয়াদী বীমার সুবিধা ভােগ করা হয়।

 

সাময়িক বীমা পত্র কি বা কাকে বলে?

সাময়িক বীমা সাধারণতঃ ২ থেকে ৭ বৎসর পর্যন্ত স্বল্প মেয়াদের জন্য করা হয়। এক্ষেত্রে বীমার সময়ের মধ্যে মারা গেলে বীমার দাবী পাওনা হয়। আর মারা না গেলে কোন দাবী বীমাকৃত ব্যক্তি চাইতে পারে না। এতে প্রিমিয়াম খুবই কম দিতে হয়। উল্লেখ্য যে সাময়িক বীমা সব সময় মুনাফা বিহীন হয়ে থাকে।

এ ধরনের বীমা নিম্ন লিখিত ব্যক্তিদের জন্য প্রযােজ্য

  • বিশেষ কারণে যাতের অল্প সময়ের জন্য অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা প্রয়ােজন হয়।
  • যাদের দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রতিরক্ষা প্রয়ােজন, কিন্তু সাময়িক ভাবে স্বাস্থ্য খারাপ বা বেশী প্রিমিয়াম দিতে অক্ষম।
  • কোন কারবারী তার কারবারের প্রাথমিক পর্যায়ে কোন কারবারী বিপদ মােকাবেলার লক্ষ্যে এ ধরনের বীমা গ্রহণ করতে পারে।
  • কারবারীর মূল ব্যক্তির জন্য এ ধরনের বীমা প্রযােজ্য।
  • একজন বন্ধক দাতার সম্পত্তি রক্ষার জন্য এ ধরনের বীমা গ্রহণ করে থাকে।
  • কোন ব্যক্তি তার সন্তানের লেখা পড়ার জন্য এ ধরনের বীমা গ্রহণ করতে পারে।
  • অল্প সময়ের জন্য বীমা করতে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য প্রযােজ্য।

 

 

সাময়িক বীমা আবার কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায় –

১. সরল বা স্বল্পকালীন সাময়িক বীমাপত্র

এ বীমার মেয়াদ মাত্র দু’বৎসর। এ সময়ের মধ্যে বীমাকৃত ব্যক্তির মৃত্যু না হলে কোন বীমাদাবী পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে শুরুতে একটি মাত্র বীমা কিস্তি প্রদান করতে হয়। এতে ডাক্তারী পরীক্ষার ফি প্রদান করতে হয়। এ বীমা পত্রে তেমন কোন লাভ নেই। তবে এ বীমা রূপান্তর বা পরিবর্তন যােগ্য।

 

২. নবায়ন যােগ্য সাময়িক বীমা পত্র

এ জাতীয় বীমাকে কোন রূপ ডাক্তারী পরীক্ষা ব্যতিরেকেই মেয়াদ শেষে নবায়ন করা যায়। ৫৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত এ বীমা যতবার খুশী নবায়ন করা যায়। যাদের স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতি হয় তাদের জন্য এ বীমা ভাল। কারণ নবায়নে ডাক্তারী পরীক্ষা লাগে না।

 

৩. পরিবর্তন বা রূপান্তর যােগ্য বীমাপত্র

যে সাময়িক বীমাকে মেয়াদী বা আজীবন বীমাপত্রে রূপান্তর বা পরিবর্তন করা যায় তাকে রূপান্তর বা পরিবর্তন যােগ্য বীমা বলে। মেয়াদ শেষের দু’বৎসরের মধ্যে কোনরূপ ডাক্তারী পরীক্ষা ছাড়াই মেয়াদী জীবন বীমা ও সীমিত কিস্তি সম্পন্ন বীমা আজীবন বীমাতে রূপান্তর করা যায়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়ােজন যে শুধুমাত্র ১ম শ্রেণীর জীবনের জন্য এ ধরনের বীমা ইস্যু করা হয়।

৪০ বৎসরের উপর কোন ব্যক্তিকে, সামরিক বাহিনীসহ কোন বিপদজনক পেশার মানুষ বা মহিলাদের জন্যও এ ধরনের বীমা পত্র প্রদান করা হয় না। নূন্যতম মূল্য ৫,০০০ টাকা, এবং তা ৫, ৬ ও ৭ বছর মেয়াদে ইস্যু করা হয়। এ বীমাপত্রের প্রিমিয়াম একক, অর্ধবার্ষিক বা বার্ষিক ভিত্তিতে কিস্তি পরিশােধ করা যায় । যেহেতু সমর্পন মূল্য, পরিশােধিত মূল্য বা রিবেট প্রদানের সুযােগ নেই সেহেতু এ বীমার বীমা কিস্তিও অপেক্ষাকৃত কম।

 

মেয়াদী বীমা কাকে বলে?

যে বীমার কিস্তি দীর্ঘ মেয়াদ ধরে পরিশােধের সুবিধা সহ বহুবিধ সুবিধা পাওয়া যায় তাকে মেয়াদী বীমা বলে। মেয়াদী বীমা আবার অনেক ধরনের হতে পারে।

 

নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মেয়াদী বীমার বর্ণনা দেয়া হলাে:

১. বিশুদ্ধ মেয়াদী বীমা:

এ ধরনের বীমার ক্ষেত্রে বীমাকৃত ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত বেচে থাকলেই শুধু বীমার দাবী পেতে পারে। কিন্তু মেয়াদের পূর্বে বীমাকৃত ব্যক্তির মৃত্যু হলে বীমা প্রতিষ্ঠানের পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বীমা কিস্তির টাকা ফেরতের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

 

২. সাধারণ মেয়াদী বীমা:

এ ধরনের বীমাকৃত ব্যক্তি মেয়াদ শেষ হবার পূর্বে মারা গেলে তার মনােনিত ব্যক্তিকে অথবা মেয়াদ শেষে বীমাকৃত ব্যক্তি বেচে থাকলে মেয়াদ শেষে বা চুক্তি অনুযায়ী তাকে বীমা দাবীর অর্থ প্রদান করা হয়। সাধারণ মেয়াদী বীমাপত্র প্রকৃত পক্ষে সামাজিক বীমা ও বিশুদ্ধ মেয়াদী বীমার যুক্তরূপ।

 

সাধারণ মেয়াদী বীমার সুবিধা

১. বিনিয়ােগ ও প্রতিরক্ষার সুবিধা ভােগ করা যায়;

২. শেষ বয়সে নিরাপত্তা ও পরিবার রক্ষার সুবিধা পাওয়া যায়;

৩. দীর্ঘ জীবন ও অকাল মৃত্যু উভয়ের ঝুঁকি মােকাবেলা করা যায়;

৪. বাধ্যতামূলক ভাবে সঞ্চয়ী করে তুলে;

৫. সন্তানদের লেখা পড়া, বিবাহশাদি ও অন্যান্য সুবিদা প্রদান করা যায়;

৬. জীবন বীমার সাধারণ সকল সুবিধা ভােগ করা যায়। এ ধরনের বহুবিধ সুবিধা থাকায় সাধারণ মেয়াদী বীমার জনপ্রিয়তা অধিক। তাই সাধারণ জনগণ জীবন বীমা বলতে সাধারণ মেয়াদী বীমাকেই বুঝে থাকে।

 

যৌথ-জীবন মেয়াদী বীমা কি বা কাকে বলে?

যে বীমাপত্রে একাধিক ব্যক্তি যৌথভাবে একটি মেয়াদী বীমাপত্র গ্রহন করে তাকে যৌথ জীবন মেয়াদী বীমা বলে। এক্ষেত্রে যেকোন একজন বীমাকৃত ব্যক্তির মৃত্যু হলে বা মেয়াদান্তে বীমার দাবী পরিশােধ করা হয়। বীমা কিস্তি মেয়াদ পর্যন্ত অথবা যে কোন একজনের মৃত্যু পর্যন্ত প্রিমিয়াম প্রদান করতে হয়। সাধারণতঃ অংশীদারী কারবারী বা দম্পতিদের জন্য এ ধরনের বীমা উপযােগী।

See also  দুর্ঘটনা বীমা কাকে বলে, কেন দুর্ঘটনা বীমা করবেন?

 

দ্বি-গুণ আর্থিক সুবিধা সম্পন্ন মেয়াদী বীমা কি বা কাকে বলে?

এ ধরনের বীমার ক্ষেত্রে বীমাকৃত ব্যক্তি যদি মেয়াদের মধ্যে মারা যায় তবে বীমাকৃত অর্থ প্রদান করা হয় আর যদি মেয়াদ শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে তবে দ্বিগুণ অর্থ প্রদান করা হয়। এ জাতীয় বীমা ১০ থেকে ৪০ বৎসর পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু ৬৫ বৎসরের উপরের বয়সী লােকদের জন্য এ ধরনের বীমা প্রদান করা হয় না।

 

নির্ধারিত মেয়াদী বীমা পত্র কি বা কাকে বলে?

এ ধরনের বীমা পত্রে একটি নির্ধারিত সময় শেষ হবার পর বীমা দাবী পূরণ করা হয়। নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কেউ মারা গেলে প্রিমিয়াম বন্ধ থাকবে কিন্তু বীমার টাকা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করার পার পাবে। তবে সেক্ষেত্রে বাট্টা দিয়ে নির্ধারিত সময়ের পূর্বেও টাকা পাওয়া যায়। শিক্ষা বৃত্তি বীমা পত্র ও এ ধরনের বীমা সাধারণত সন্তানদের লেখা পড়া করার জন্য গ্রহণ করা হয়।

নির্ধারিত সময় পর বৃত্তি আকারে বীমাকৃত অর্থের টাকা পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে সন্তানের পক্ষে পিতামাতা বা কোন অভিভাবকের নামে বীমা করা হয়। যার নামে বীমা করা হবে তার ডাক্তারী পরীক্ষা করা হয়।

সাধারণতঃ ৫ বৎসর মেয়াদী সমান কিস্তিতে বীমার অর্থ বৃত্তি আকারে প্রদান করা হয়। ত্রি-সুবিধা বীমা পত্র ও এ ধরনের বীমা গ্রহীতাকে নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে পলিসি হােল্ডারের মৃত্যু হলে তার নমিনিকে নিম্ন লিখিত তিনটি সুবিধা প্রদান করা হয়।

  1. বীমা গ্রহীতার মৃত্যু হলে মনােনিত ব্যক্তিকে বা পলিসি হােল্ডারের উপর নির্ভরশীল ব্যক্তি বা পােষ্যদেরকে বীমাকৃত অর্থ পরিশােধ করা হয়;
  2. নির্ধারিত হারে বােনাস প্রদান করা হয়; এবং
  3.  নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত পলিসি হােল্ডার জীবিত থাকলে মূল বীমাকৃত অর্থ নগদ প্রদান করা হয়। বীমাকৃতের মৃত্যুর পর বীমাপত্রের সমমূল্যের একটি পূর্ণ-পরিশােধিত আজীবন বীমাপত্রের পরিমাণ অর্থ পরিশােধ করা হয়।

 

অপ্রত্যাশিত মেয়াদী বীমা পত্র

এ বীমাপত্র মেয়াদ পূর্তির মধ্যে বীমাকৃত ব্যক্তির মৃত্যুর পূর্বেই বীমাকৃত অর্থের একটি অংশ নির্দিষ্ট সময়ান্তে বীমাকারী বীমাকৃত ব্যক্তিকে প্রদান করে থাকে। এবং বাকী অংশ বীমার মেয়াদ শেষে পরিশােধ করে থাকে। তবে যদি বীমাকৃত ব্যক্তি মেয়াদ পূর্তির আগেই মারা যায় তবে পূর্বের প্রদত্ত অর্থ কর্তন ব্যতিরেকেই বীমাকৃত পূর্ণ অর্থ প্রদান করে থাকে।

 

বহুমুখী উদ্দেশ্য বা সুবিধাসম্পন্ন বীমা পত্র

এ শ্রেণীর বীমা পত্র মানব জীবনের বহুমুখী প্রয়ােজন পূরণ করে থাকে বিধায় একে এ ধরনের নামকরণ করা হয়েছে। যেমন বৃদ্ধ বয়সে প্রয়ােজন, মৃত্যুজনিত প্রয়ােজন, সন্তানদের শিক্ষা, বিবাহ ইত্যাদি সংক্রান্ত সুবিধা এ ধরনের বীমা পত্রে পাওয়া যায়। এ জাতীয় বীমা পত্রে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বীমা কিস্তি পরিশােধ করা হয়।

 

শিশুদের বিলম্বিত মেয়াদী বীমা পত্র

অনেক সময় পিতামাতা তাদের অভিভাবক, তাদের সন্তান বা নিকট আত্ময়র জন্য বীমাপত্র গ্রহণ করতে পারে। এ ধরনের বীমার ক্ষেত্রে বীমা গ্রহীতা প্রথম কয়েক বৎসর প্রিমিয়াম দেয়, পরে শিশুরাই তাদের কিস্তির টাকা পরিশােধ করে থাকে। এর বড় সুবিধা হলাে প্রিমিয়ামের কিস্তি খুবই কম।

এতে করে শিশুদের মধ্যে সঞ্চয়ের মনােভাব গড়ে উঠে। বীমা পত্রটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চালালে অথবা মেয়াদের পূর্বেই কিস্তি বন্ধ করে দিলেও নিয়ম অনুযায়ী চুক্তিমত সে সময় পর্যন্ত প্রদেয় লেখা পড়া ও বিবাহের ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থ পেয়ে থাকে।

 

কিস্তি পরিশােধের ভিত্তিতে বীমার শ্রেণী বিভাগ (Classification on the basis of payment of installment)

কিস্তি পরিশােধের দৃষ্টিকোন থেকে বীমা ২ শ্রেণীর হতে পারে।

যথা

  1. একক কিস্তি সম্পন্ন বীমা পত্র ; এবং
  2. বার্ষিক বা সমকিস্তি সম্পন্ন বীমাপত্র।

 

নিম্নে এ দুটি শ্রেণীর বীমা সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলােঃ

১. একক বা এককালীন কিস্তি সম্পন্ন বীমা পত্র:

যে বীমা পলিসিতে একটি মাত্র কিস্তির মাধ্যমে বীমার প্রিমিয়াম পরিশােধের সুযােগ থাকে তাকেই একক বা এককালীন কিস্তি সম্পন্ন বীমা পত্র বলে। এতে আপাততঃ বেশি পরিমাণ টাকা একত্রে দিতে হয় তবে কিস্তিতে পরিশােধ যােগ্য বীমার মােট টাকার চেয়ে কম প্রিমিয়াম দিতে হয়।

সাধারণতঃ কম মেয়াদী বীমার ক্ষেত্রে এককালিন কিস্তি প্রদানের রীতি প্রচলিত। তবে যাদের অর্থের প্রাচুর্য আছে তাদের জন্য এ ধরনের বীমা বেশী প্রযােজ্য। মেয়াদী ও সাময়িক এ উভয়বিধ বীমার মধ্যেই একক কিস্তি সম্পন্ন বীমা পত্র প্রচলিত আছে।

 

২. বার্ষিক বা সমকিস্তি সম্পন্ন বীমা পত্র:

এ ধরনের বীমা পত্রে বার্ষিক, অর্ধ বার্ষিক, ত্রৈমাসিক অথবা মাসিক কিস্তিতে প্রদেয় কিস্তিসমূহ সম-পরিমাণ হয় বলে একে সমকিস্তি বীমা বলা হয়। বার্ষিক বলা হয় এজন্য যে সাধারণত বার্ষিক ভিত্তিতে প্রিমিয়াম দেয়া হয়। এতে বীমা গ্রহীতার ঝামেলা কম, তবে অন্যান্য মেয়াদেও হতে পারে। এ ধরনের বীমা সাধারণতঃ মেয়াদী বীমার আওতাভুক্ত হিসেবেও বিবেচিত।

 

মুনাফায় অংশগ্রহণ মােতাবেক শ্রেণী বিন্যাস (Classification on the Basis of Participating in Profit)

মুনাফা অংশ গ্রহণ অসুবিধা অনুযায়ী বীমা ২ প্রকার। যথা

১. মুনাফা যুক্ত বীমা পত্র এবং

২. মুনাফা বিহীন বীমা পত্র।

 

নিম্নে এ দুটি বীমা পত্র সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলাে

১. মুনাফা যুক্ত বা মুনাফায় অংশ গ্রহণকারী বীমা পত্র

যে বীমাপত্রের বীমা গ্রহীতাকে বীমা কোম্পানী লাভ্যাংশ প্রদান করে থাকে তাকে মুনাফাযুক্ত বীমা পত্র বলা হয়। তবে কোন লােকসান হলে বীমা গ্রহীতা তার অংশ বহন করবে না। শুধুমাত্র লাভ হলেই সে বৎসর বােনাস পাবে। তবে লাভ্যাংশবিহীন বীমা পত্র থেকে লভ্যাংশ যুক্ত বীমার প্রিমিয়াম বেশী প্রদান করতে হয়।

 

২. মুনাফা বিহীন বীমা পত্র

যে বীমাপত্রে বীমা গ্রহীতা বীমাকোম্পানীর লাভের কোন অংশ পায়না তাকে মুনাফাবিহীন বীমা পত্র বলে। শুধুমাত্র বীমাকৃত অর্থ পায়। তাই এতে লাভযুক্ত বীমা পত্র থেকে কম কিস্তি বা সেলামী প্রদান করতে হয়।

 

 বীমাকৃত ব্যক্তির সংখ্যা অনুযায়ী শ্রেণী বিন্যাস (Classification on the Basis of the Number of the Insurance)

বীমাকৃত ব্যক্তির সংখ্যা অনুযায়ী বীমাকে দু’শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়।

যথা-

  1. একক জীবন বীমা পত্র ও
  2. বহুজীবন বীমা পত্র।

 

১. একক জীবন বীমা পত্র

যে বীমা পত্রে বীমা গ্রহীতা বা বীমাকৃত ব্যক্তি একজন মাত্র থাকে একক জীবন বীমাপত্র বলে।

 

২. বহু জীবন বীমা পত্র

যে বীমা পত্রে একাধিক বা বহু জীবন একত্রে বীমাকৃত হয় তাকে বহু জীবন বীমাপত্র বলে।

 

বহু জীবন বীমা পত্র আবার দু’রকম হতে পারে।

 

ক) যৌথ জীবন বীমা পত্র

যে বীমাপত্রে দুই বা ততােধিক জীবন একই সাথে বীমাকৃত হয়ে থাকে এবং এর | বীমাকৃত অর্থ যেকোন একজনের মৃত্যুর পর প্রদেয় হয় তাকে যৌথ জীবন বীমা পত্র বলে। এ ধরনের বীমা

সাধারণতঃ অংশীদারদের এবং দম্পত্তির জন্য উপযােগী।

 

খ) শেষ উত্তরজীবী বীমা পত্র

এ ধরনের যৌথ জীবন বীমার ক্ষেত্রে সর্বশেষ বীমাকারীর মৃত্যুর পর বীমার দাবী পরিশােধ করা হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত একজনও বেচে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত বীমার দাবী পরিশােধ করা হয় না।

 

বীমাকৃত অর্থ পরিশােধের ভিত্তিতে বীমার শ্রেণী বিন্যাস (Classification on the basis of the payment of claim)

১. বীমাপত্র:

যে বীমা পত্রের বীমাকৃত ঘটনা সংঘটনের পরিপেক্ষিতে বীমাকৃত অর্থ একবারে থেকে হিসেবে প্রদান করা হয়, তাকে একক বীমা পত্র বলে।

 

২. কিস্তি বা বৃত্তি বীমা পত্র

যে বীমাপত্রের বীমাকৃত অর্থ এককালীন পরিশােধ না করে কিস্তিতে অনেক দিন ধরে পরিশােধ করা হয় তাকে কিস্তি বা বৃত্তি বীমা পত্র বলে। উপরি উল্লিখিত শ্রেণী বিভাগ ছাড়াও আর কয়েক ধরনের বীমা হতে পারে। তন্মধ্যে গােষ্ঠী বা গ্রুপ বীমা অন্যতম।

গােষ্ঠী বা গ্রুপ বীমা ও এ ধরনের বীমা সাধারণতঃ কোন গােষ্ঠি বা একটি প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একই বীমার অধীনে বীমা করা হলে তাকে গােষ্ঠী বীমা বা গ্রুপ বীমা বলা হয়। এক্ষেত্রে কোন সদস্যদের মৃত্যু হলে নির্দিষ্ট পরিমাণ | টাকা প্রদান করা হয়। এতে প্রিমিয়ামের পরিমাণ খুব কম। দিন দিন এ ধরনের বীমা আমাদের দেশেও ব্যাপক প্রসার লাভ করছে ও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

Related Articles

Back to top button